সবুজবাংলা২৪ডটকম, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) : গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরসভায় বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরইউটিডিপি) এর আওতায় ২২ অক্টোবর ২০২৫ এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের পৌরসভাগুলোকে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, গ্রামীণ নগর অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং জলবায়ু সহনশীল নগরায়ন গড়ে তোলাই এ মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দেশের ৮১টি পৌরসভা ও ৬টি সিটি কর্পোরেশনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মোট ৩৬টি জেলার ওপর বিস্তৃত। আধুনিক নগর সুবিধা বিনির্মাণে পলাশবাড়ী পৌরসভাকে উল্লেখযোগ্য মনে করে এখানে প্রথম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাতৃসদন, কমিউনিটি সেন্টার, বহুমুখী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বহুমুখী মার্কেট ও মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে জায়গার সীমাবদ্ধতা এসব উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন পৌরসভার সহকারী ইন্জিনিয়ার মর্তুজা এলাহী।
অন্যদিকে, সচেতন নাগরিকরা মনে করেন এসব গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক স্থাপনার জন্য পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘অফিসের হাট’ এর জায়গাই সর্বোত্তম স্থান। তারা অভিযোগ করে বলেন, বহু বছর ধরে বেদখল থাকা এ সম্পত্তি দ্রুত উদ্ধার করলে আধুনিক নগর সুবিধা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
জানা যায়, পলাশবাড়ী পৌরসভার জামালপুর মৌজার ১১০৩ দাগে মোট ২ একর ৪৮ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী অফিসের হাটের মাত্র ৪৫ শতাংশ জমি বর্তমানে পলাশবাড়ী উপজেলা মডেল মসজিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকি ২ একর ৩ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে দখলদারদের দখলে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থাপনা জটিলতা ও অনিয়মের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
পৌরবাসীর বলেন অফিসের হাটের সম্পত্তি দ্রুত উদ্ধার করে পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে এনে নগরবাসীর প্রয়োজনীয় নাগরিকসেবা নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পিত স্থাপনার অনেক গুলোই ওই স্থানেই নির্মাণ করা সম্ভব। এতে পৌরসভার উন্নয়ন ও নগরপরিকল্পনার অগ্রযাত্রা আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
পলাশবাড়ী হানাদার মুক্ত দিবস আজ
পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) : ঐতিহাসিক দিন আজ ৮ ডিসেম্বর। একাত্তরের এইদিনে রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলা হানাদারমুক্ত করেছিলো আমাদের অহংঙ্কার বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ । ৭১ এর এদিনে হানাদার বাহিনী পতনের পর এলাকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিকামি মানুষের উল্লাস আর উদ্দ্যামতা।
বীরমুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়, ১৯৭১ সালের গোটা মার্চ মাস জুড়ে পলাশবাড়ী এলাকা ছিল উত্তাল। এই উত্তাল দিনগুলোতে পাকবাহিনী বীর সেনাসহ ৫ শতাধিক এর অধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। পাকবাহিনী সেদিন পাবনা জেলার ঐতিহ্যবাহী নারিন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎসময়ের প্রধান শিক্ষক গর্বিত পিতা আব্দুল আজিজ ও মাতা ফাতেমা বেগম দম্পতির বীর সন্তান শহিদ লেফঃ রফিককে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তিনি আমাদের পলাশবাড়ীতে শহীদ হয়েছেন।
আর ২৬ মার্চ কালোরাতে স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পলাশবাড়ী আক্রমণ করে। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। সে সময় পাকহানাদার বাহিনীর এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, পিচ কমিটির সদস্য সেদিন অত্র এলাকার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ক্ষতি সাধন করেছিল প্রায় কোটি-কোটি টাকার সম্পদ। সড়ক পথে ভারী অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসা ৬০ জন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) বাহিনীর সাথে বাঙালি সুবেদার আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ব্যবহার হয় মেশিনগান আর কামানসহ বিভিন্ন ভারী সমরাস্ত্র । সারাদিন যুদ্ধে উভয় দলের ২১ জন সৈনিক আত্মাহুতি দেয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন- শহিদ লে. রফিক ও কালিবাড়ী হাটে আসা গৃধারিপুর গ্রামের আঃ মান্নান।
এদিকে, ২৮ মার্চ সকাল থেকেই পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা পলাশবাড়ীতে শুরু করে জ্বালাও-পোড়াও অভিযান। তাদের এ অভিযানে মহাসড়কের দুধারে গৃধারীপুর, নুনিয়াগাড়ী, জামালপুর, মহেশপুর, বাঁশকাট, নিশ্চিন্তপুর, বৈরীহরিনমারী উদয়সাগরসহ ঐতিহ্যবাহী কালীবাড়ী বাজার আগুনে পুড়ে ছারখার করে দেয়। এখান থেকেই হানাদারদের বর্বরতা, পৈশাচিকতা শুরু হয়। হায়েনারা প্রতিদিন গোটা থানা এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতীদের ধরে এনে তাদের শক্ত ঘাটি সদরের সড়ক বিভাগে নিয়ে গিয়ে (সিএমবি) অন্ধকার রুমে রেখে রাতভর ধর্ষণের পর বায়োনোট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রাখত।
এরপর পাষন্ডরা কালীবাড়ী বাজার লুটসহ কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। সে সময় পাক হানাদার বাহিনীর দোসররা কাশিয়াবাড়ী এলাকার বাসিন্দাদের জোর পূর্বক টেনে হেঁচড়ে একত্রিত করে চতরা ঘোড়াঘাট সংযোগ স্থলের পশ্চিম রামচন্দ্রপুর গ্রামে সাঁরি করে নৃশংস ভাবে হত্যা করে প্রায় ৩ শতাধিক নারী পুরুষকে। সেদিন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়, চকবালা গ্রামের সাগের আলী, আমির আলী ও সগুনা গ্রামের আনিছুর রহমান বাদশা । এসময় লুকিয়ে থাকা নারী- পুরুষদের গগন বিদারী আহাজারিতে কাশিয়াবাড়ীর আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। এ নৃশংস হত্যা যজ্ঞের করুন কাহিনীর সারসংক্ষেপ সেদিন স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার হয়েছিল। সাগের আলী (৮৫) সেদিনের মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে যায়।
হানাদার বাহিনী সেদিন শুধু গণহত্যাই করেনি, এদের কোপানালে সেদিন ধর্ষিত হয়েছিলেন কাশিয়াবাড়ীর ফুলবানু, গিরিবালা, অন্তঃসত্ত্বা হাজেরা বেগমসহ অনেকে। সেদিন একজন পাকিস্তানি ঘাতক সেনা লে. রফিকের শরীরের পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি চালায়। পাবনা জেলার ঐতিহ্যবাহী নারিন্দা উচ্চবিদ্যালয়ের তৎসময়ের প্রধান শিক্ষক ও গর্বিত গৃহিণী মা ফাতেমা বেগমের বীর সন্তান লে. রফিক সেদিন পলাশবাড়ীতে শহিদ হন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাক বাংলো ছাড়াও সদরের গৃধারীপুর গ্রামের খাইরুলের দিঘীর পাড়, বৈরী হরিনমারী, সদরের সরকারি মডেল প্রাথমিক স্কুল, ঝাপড় মুংলিশপুর, জামালপুর, উদয়সাগর, কাশিয়াবাড়ী হাইস্কুলের পাশে, পশ্চিম রামচন্দ্রপুর, কলাগাছী ও আমবাগানসহ উপজেলার অনেক স্থানেই গণকবরের স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে।
পলাশবাড়ী থানা এলাকার ৬৫জন বীর সন্তান সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। তন্মধ্যে গোলাম রব্বানী, আনজু মন্ডল, আঃ লতিফ, আবুল কাসেম, হাসবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নুরুন্নবী মাস্টার এবং বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর বাহিনীর ২৬ জন এবং মুজাহিদ বাহিনীর কয়েকজন জওয়ান শহীন হন। ৮ ডিসেম্বর পলাশবাড়ী শক্র মুক্ত হলে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীসহ অত্র এলাকার হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ছাড়াও সর্বস্তরের জনতা আনন্দ- উৎসবের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ এলাকায় মায়ের কোলে ফিরে এসেছিল। অনেকেই ফিরে আসেনি। শহিদ হয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে। আর এভাবেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সেদিন পাক হানাদার বাহিনীর কবল হতে মুক্ত হয় পলাশবাড়ী উপজেলা।