সবুজবাংলা২৪ডটকম, মাধবদী (নরসিংদী) : নরসিংদীর মাধবদীতে নতুন আতঙ্কের নাম অনলাইন জুয়া। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে জুয়া বহু পুরনো ও প্রচলিত একটি বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে জুয়ার ধরনও বদলে গেছে সারাদেশসহ মাধবদীতেও। আজকাল অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় অনলাইন জুয়ার প্রতি মানুষের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। কৌতূহল থেকে শুরু করে ‘সহজে আয়’ এমন ভাবনায় তরুণ প্রজন্ম নানান অনলাইন জুয়ার সাইটে আকৃষ্ট হচ্ছে। গোপন পদ্ধতিতে নতুন কৌশলে অনেক টাকা আয়ের সুফল দেখানো হচ্ছে, ফলে শহর-গ্রাম সবার মধ্যে এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। নরসিংদী জেলার মাধবদী পৌর শহর সহ আশপাশের গ্রাম-গঞ্জে থেকে শুরু করে অনলাইন জুয়া ইতোমধ্যেই তৃণমূল পর্যন্ত পৌছে গেছে। প্রতিদিন হাজারো যুবক অনলাইনে বাজি ধরে নিঃস্ব হয়ে ফিরছেন, এক ক্লিকে লাখ লাখ টাকা উড়ে যাচ্ছে। কলেজ ছাত্র থেকে মধ্যবয়স্ক, ব্যবসায়ী বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার, কর্মচারী, ফুটপাতের চা দোকানি, সেলুনকর্মী, হকার, বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী, বিক্রয়কর্মী, ভবঘুরে, বাস-ট্রাক চালক, সিএনজি চালক, নির্মান শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, রিকশাচালক ও দিনমজুর অনেকেই দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এই অনলাইনে বাজি ধরায় ব্যস্ত থাকেন। অনেকেরই শুরু হয় এক হাজার টাকা বা আরও বেশি টাকা দিয়ে। পরবর্তী পর্যায়ে তা ১০ হাজার থেকে এক লাখ কিংবা তারও বেশি হয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের সব সম্পদ শেষ হয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরছেন অনেকে। মাধবদী পৌরশহর সহ আশপাশের ইউনিয়ন ও ছোট-ছোট গ্রামগুলোতেও এ জুয়ার বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনলাইনে হারানো টাকা জোগাড় করতে না পেরে অনেক তরুণ চুরি-ছিনতাইয়ের পথে নামছে। ইদানিংকালে মাধবদী এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। মাধবদী সাবেক রেললাইন এলাকায় প্রতিদিনই দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে সড়কে চলাচলরত যাত্রীদের থেকে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে। কিশোররা জোটবদ্ধ হয়ে গ্যাং গঠন করে রাতে চেতনানাশক স্প্রে প্রয়োগ করে সর্বস্ব লুট করছে এই ধরনের ঘটনায় এলাকাবাসী আতঙ্কে আছে।
ভুক্তভোগী মামুনুর রশিদ বলেন, শিবপুর থেকে বাসে ঢাকা যাওয়ার পথে কিশোর গ্যাং চেতনানাশক স্প্রে ব্যবহার করে আমার কাছে থাকা সব টাকা ছিনিয়ে নেয়। অচেতন অবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখন আমরা অনিরাপদ জীবন কাটাচ্ছি। আগে চিহ্নিত চোর-ডাকাতদের ভয় ছিল, আর এখন উঠতি বয়সী কিশোররা গ্যাং তৈরি করে একই কায়দায় লুটপাট করছে। মাদক ও অনলাইন জুয়ার টাকার নেশায় তাদের এই বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। অপরদিকে নিঃস্ব হওয়া যুবক ওসমান গনি জানান, নেশায় পড়ে লাখ লাখ টাকা হারিয়েছি। ধার করে খেলেছি দেনার দায়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছি। এখন আর কেউ টাকা দিতে চায় না। আমরা এখন সব হারিয়ে দিশেহারা। স্থানীয়রা বলছেন, এ সমস্যা কেবল আর্থিক নয়। সামাজিক নিরাপত্তা, গণপরিবেশ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরে প্রভাব নিয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ ও প্রশাসনকে মিলে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগ ও পূনর্বাসনমূলক উদ্যোগ দ্রুত গ্রহণ করতে হবে এটাই এলাকার মানুষের দাবি।
এ ব্যাপারে মাধবদী থানার এস আই মোঃ আল আমিন জানান, অনলাইন জুয়ার ব্যাপারে থানায় কেউ কখনো অভিযোগ করেনি। নানা কারণে সর্বশান্তরা থানায় আসতে ভয় পায়। মোবাইলে জুয়ার বিরুদ্ধে আমরা তৎপর আছি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনলাইন জুয়া আমাদের সমাজের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে নানা ধরনের অপরাধ যেমন চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং সক্রিয়তা জড়িত। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক মাধবদী শাখার সভাপতি মোঃ মকবুল হোসেন বলেন, মোবাইলে জুয়া খেলে টাকা ইনকামের নেশায় কিশোর-তরুণরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। আর সেই টাকার যোগান দিতে গিয়ে তারা চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে আছি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অনলাইন জুয়ার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যাতে অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। একইসঙ্গে, জনগণকে সচেতন করতে প্রশাসন সভা-সেমিনার, বিদ্যালয়-মাদ্রাসায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। আমাদের উদেশ্য ও লক্ষ্য শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং মানুষকে বোঝানো যে অনলাইন জুয়া তাদের পরিবার, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে।