সবুজবাংলা২৪ডটকম, পিরোজপুর : পিরোজপুরে বিএনপির রাজনীতি আজ আলোচনার কেন্দ্রে এক বিতর্কিত ব্যক্তির কারণে। তিনি সরোয়ার হোসেন—পৌর বিএনপির সদস্য সচিব। তৃণমূলে কেউ কেউ তাঁকে বলেন “আওয়ামীপন্থী বিএনপি নেতা”। তাঁর আচরণ, রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক উত্থান ও প্রভাব বিস্তারের ধরণ ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সরোয়ারের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন, টোনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, যিনি প্রকাশ্যে একজন আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী সরকারের আমলেও তার অবাধ চলাফেরা, দলীয় প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকের মতে, সরোয়ার ভাইকে রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা দিয়ে এসেছেন, আর প্রতিদানে ভাই আনোয়ারও সরোয়ারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন।
সরোয়ারের প্রভাব শুধু নিজের পদেই সীমাবদ্ধ নয়। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী নেতা এস. এম. বাইজিদ হোসেন, যিনি বর্তমানে একাধিক মামলায় পলাতক—তাঁর ঠিকাদারি ও আর্থিক কর্মকাণ্ডও দেখভাল করেন সরোয়ার। এমনকি নির্বাচনী মিটিং-মিছিলে বাইজিদের লোকজনও ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, দলের ভিতরে নয়, বাইরের মাফিয়া সিন্ডিকেটেও সরোয়ারের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
সাবেক ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সরোয়ার দীর্ঘদিন ধরেই জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বিশেষ করে পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত তিনি। অথচ বিএনপির পদধারী হয়েও আওয়ামী সরকারের আমলে প্রকাশ্যে সক্রিয় ছিলেন, যা দেখে অনেকেই বিস্মিত।
একসময় সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া সরোয়ার চলাফেরা করতেন রেন্ট-এ-কার মোটরসাইকেলে। বর্তমানে তাঁর বাহন এক্স-নোয়া স্কয়ার গাড়ি, যা স্থানীয় সূত্র মতে, সাবেক এক প্রভাবশালী আওয়ামী এমপি তাকে উপহার দিয়েছেন। বিনিময়ে সরোয়ার আওয়ামী ঘরানার লোকদের নানা সুবিধা দিচ্ছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসীরা জানান, হুলারহাটের কচা নদীতে রাতের আঁধারে চোরাচালান সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেন সরোয়ার হোসেন। তার আচরণ, আর্থিক উত্থান ও রাজনৈতিক যোগাযোগ যেন রাতারাতি পাল্টে গেছে—এমন মন্তব্য করেছেন অনেকে: “আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, গোররে পদ্মফুল!”
গত ৬ জুলাই পিরোজপুর পৌর বিএনপির কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও একাধিক প্রার্থী ও নেতাকর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে তা স্থগিত করা হয়। অভিযোগ—সরোয়ার কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় করে ও নির্বাচনী ফরমে অর্থ ঢেলে কাউন্সিল প্রভাবিত করেছেন। এর ফলে ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টিতে তাঁর প্রার্থীরা বিজয়ী হন।
বিশেষভাবে ১ নম্বর ওয়ার্ডের ত্যাগী নেতা রুহুল আমিনকে ফরম কিনতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তৃণমূলে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা জালাল ফকির, যিনি রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার এবং বহু মামলার মুখোমুখি হয়েও দল ত্যাগ করেননি—তাকেও এবারের কাউন্সিলে শুধুমাত্র এক আওয়ামী নেতার সঙ্গে পুরনো একটি ছবি থাকার অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়।
তৃণমূলের প্রশ্ন—একজন ‘ছবি’র কারণে বাদ পড়লেন, অথচ সরোয়ার যিনি একাধিক আওয়ামী শীর্ষ নেতার ছায়ায়, গাড়ি উপহারপ্রাপ্ত ও তাদের সঙ্গে রাজনীতি করছেন—তাঁকে সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হলো কেন?
বহু ত্যাগী ও নির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মী অভিযোগ করেছেন—সরোয়ারের মতো বিতর্কিত ও দুর্নীতিপরায়ণ নেতাকে পকেট কমিটির মাধ্যমে উপরে তোলা হলে সংগঠন ধ্বংসের মুখে পড়বে। তাঁরা তদন্ত করে সরোয়ারের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
সরোয়ার হোসেনের রাজনীতি কি আদর্শনির্ভর, না কি কেবল সুবিধাভোগের কৌশল? তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও মুখোশ পিরোজপুর বিএনপির ভবিষ্যৎকে কোন পথে নিয়ে যাবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঠিক সিদ্ধান্ত ও নিরপেক্ষ তদন্তই কেবল সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে পারে।