সবুজবাংলা২৪ডটকম, ঢাকা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার সব ধরনের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন, একই সঙ্গে সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা ও ভুলের ক্ষেত্রে গঠনমূলক বিরোধিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট আমলে যতগুলো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—খুন, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ধর্ষণ—প্রত্যেকটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।” তার এই বক্তব্যে সংসদে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং বিচার ও জবাবদিহিতা প্রশ্নটি আবারও সামনে চলে আসে।
বিচার নিয়ে প্রশ্ন, ‘সবুজ পতাকা’ প্রত্যাশা
বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বিচারের দিকে তাকিয়ে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না—বিচারের অঙ্গনে সবুজ পতাকা উঠছে, না লাল পতাকা, না কালো পতাকা? আমরা একটা সবুজ পতাকা দেখতে চাই।” তিনি ইঙ্গিত দেন, বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের কান্না যেন সংসদের ওপর অভিশাপ হয়ে না আসে, সে জন্য দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। “মজলুমদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে”—এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিচার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
সংবিধান নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট
সংবিধান প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশের বর্তমান সংবিধান মেনেই তারা সংসদে অংশ নিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান পরবর্তী সময়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করেছিলেন।
তিনি বলেন, “সংবিধান না মানলে আমরা এখানে আসতাম কীভাবে? যতদিন এই সংবিধান থাকবে, আমরা এর পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করতে পারি, কিন্তু বিদ্রোহ করব না।” তার এ বক্তব্যে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দখলবাজি ও দলীয় কোন্দলের কারণে অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে গেছে। “মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ জিম্মি থাকতে পারে না”—এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন।
এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে। তার মতে, নিরাপত্তাহীনতা দূর না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।
শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান
শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার বিষয়টি তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমরা আর দেখতে চাই না—দায়র কোপে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে কোনো শিক্ষার্থীর জীবন ঝরে যায়।” তিনি সব রাজনৈতিক দলকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখার আহ্বান জানান।
তার মতে, শিক্ষাঙ্গন এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত যেখানে একজন শিক্ষার্থী শিশু হিসেবে প্রবেশ করে দক্ষ, নৈতিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে বের হয়ে আসবে। “আমরা সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখতে চাই”—বলেন তিনি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বের দাবি
দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই দুই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখনো শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সন্ত্রাস বন্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দল ও জনগণকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সংসদের এ অধিবেশনে তার বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক খাতের চ্যালেঞ্জগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।