সবুজবাংলা২৪ডটকম, নরসিংদী : নরসিংদীর মাধবদীতে কোরবানির পশু জবাই, মাংস কাটাকাটি ও চামড়া ছাড়ানোর জন্য কসাইদের নির্ধারিত কোনো সরকারি মূল্য না থাকায় প্রতিবারের মতো এবারও তৈরি হয়েছে চরম ভোগান্তি। এলাকাভেদে এবং কসাইভেদে ভিন্ন ভিন্ন দর হাঁকা হচ্ছে। কোথাও প্রতি হাজার টাকার পশুর জন্য ১০০ টাকা, কোথাও ১৫০ টাকা আবার কোথাও ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কোরবানিদাতারা। অনেকেই বলছেন, এই খাতে সরকারি বা পৌরসভার একটি নির্ধারিত কাঠামো থাকা জরুরি।
মাধবদী পৌর শহরের বিরামপুর এলাকার বাসিন্দা ডা. ওবায়দুর রহমান প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এখনো পশু কেনেননি, কারণ শেষ মুহূর্তে কিনতে চান। কিন্তু এর আগেই তিনি কসাই ঠিক করে ফেলেছেন। তার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে প্রতি হাজার টাকার পশুর জন্য ১৫০ টাকা করে দিতে হবে। তিনিবলেন, ‘কোরবানির সময় কসাই ঠিক করাই এক ধরনের ঝামেলার কাজ। গরু কাটা ও চামড়া ছাড়ানোর কোনো নির্ধারিত মূল্য নেই। যে যার মতো দর হাঁকায়। মাধবদী বাজারের নিয়মিত কসাইরা বেশি রেট নেন, বাইরে থেকে আসা কসাইরা তুলনামূলক কম মূল্য নেন।’
তিনি আরও জানান, তার ঠিক করা কসাইরা শহরের বাইরের গ্রাম থেকে আসবেন এবং কয়েক বছর ধরে একইভাবে তার এলাকায় কাজ করছেন। তার মতে, মাধবদীতে যেহেতু হাজার হাজার পশু কোরবানি হয়, তাই পৌরসভার উদ্যোগে একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মাধবদী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য নির্ধারিত কোনো একক হার নেই। কোথাও পশু প্রতি হাজার টাকায় ১০০ টাকা, কোথাও ১৫০ টাকা আবার কোথাও ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মাধবদীর আশপাশের গ্রামগুলোতে এই হার ১০০টাকা হলেও পৌর শহরের কিছু ওয়ার্ডে এই হার ১৫০ টাকা, এলাকাভেদে কাশিপুর, বিরামপুর, টাটাপাড়া এলাকায় তা ২০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিরামপুর, টাটাপাড়া, ছোটমাধবদী এলাকাতেও এই হার প্রায় ১৫০ টাকার কাছাকাছি।
এই পার্থক্যের কারণে একই দামের পশু কোরবানি করেও খরচে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দেড় লাখ টাকার একটি গরুতে প্রতি হাজার ২০০ টাকা হিসাবে কসাইয়ের খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আর ১৫০ টাকা হলে তা হয় ২২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ শুধু মাংস কাটার খরচেই কয়েক হাজার টাকা পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এ নিয়ে মাধবদী শহরের বিভিন্ন এলাকার কোরবানিদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। তাদের মতে, বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে ঈদ হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন না। কিন্তু এটি একটি বড় আর্থিক চাপ হিসেবে দেখা দেয়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এটি অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে যোগ হচ্ছে।
পৌর শহরের ৮ নং ওয়ার্ডের কাশিপুর মহল্লার বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, বাসায় গরু কাটার মতো সক্ষম লোক না থাকায় কসাইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি এখনো গরু না কিনলেও কসাই ঠিক করে রেখেছেন। তার চুক্তি অনুযায়ী পশু ক্রয়ের প্রতি হাজারে ২০০ টাকা দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘কোরবানি, হাসলি আর কসাইয়ের বিল- সব মিলিয়ে অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে যায়। নির্ধারিত মূল্য থাকলে ভোগান্তি কমতো।’
পৌর শহরের ১০ নং ওয়ার্ডের আনন্দী মহল্লার বাসিন্দা বাবুল মিয়া বলেন, মাধবদীর স্থানীয় কসাইরা সাধারণত বেশি দাম নেন, কিন্তু বাইরে থেকে আসা কসাইরা তুলনামূলক কম নেন। এ কারণে বাজারে কোনো একক মূল্য কাঠামো তৈরি হয়নি। তিনি জানান, অনেক এলাকায় শরিকে একসঙ্গে কোরবানি দেওয়া হয়। সেখানে গরুপ্রতি নির্দিষ্ট টাকা নেওয়া হয়, যা সাধারণত ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে সেটিও কোনো সরকারি মানদণ্ড নয়, বরং স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত।
এদিকে মাধবদী বাজারের কয়েকজন পেশাদার কসাই জানিয়েছেন, তারা নিজেরাই বাজার অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করেন। কবির নামের একজন কসাই বলেন, ‘কোরবানির সময় সবাই মাংস খায়, কিন্তু আমাদের নিয়মিত কাজ থাকে না। তাই এই সময়ের আয় দিয়েই আমাদের অনেক কিছু চালাতে হয়।’ তিনি জানান, বর্তমানে তিনি সাতটি গরুর কাজের চুক্তি পেয়েছেন, সবগুলোই প্রতি হাজার ২০০ টাকা দরে। তার মতে, শ্রমিকদের খরচ বাদ দিয়েও কোরবানির মৌসুমে ভালো আয় হয়।
আরেক কসাই সেলিম মিয়া বলেন, তিনি সাধারণত ৮ থেকে ১০টি গরুর কাজ করেন এবং শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাদ দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে। তবে তিনিও মনে করেন, সরকার যদি নির্ধারিত রেট বেঁধে দেয় তাহলে বাজারে শৃঙ্খলা আসবে। তিনি বলেন, ‘সবাই যদি এক দরেই কাজ করে, তাহলে কেউ কম বা বেশি নেবে না। এতে আমাদেরও সুবিধা হবে।’
কোরবানির পশু কেনার সময় যেমন নির্ধারিত হাসলি বা ফি থাকে, তেমনি কসাইদের জন্যও একটি সরকারি মূল্য কাঠামো থাকা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা অতিরিক্ত খরচ থেকে রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে কসাইদের মধ্যেও একটি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু স্বচ্ছ বাজার তৈরি হবে। কোরবানির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনে যদি সরকারি পর্যায়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা ও মূল্য কাঠামো থাকে, তাহলে ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। এখন দেখার বিষয়, মাধবদী পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয় কি না।