সবুজবাংল্২া৪ডটকম, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলার নামাপাড়া এলাকায় সরকারি রাস্তার পাশে লাগানো প্রায় ৪৫টি গাছ গোপনে কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বনমালী মো. আব্দুল্লাহ ও তার পিতা মো. জহুরুল হকের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র এবং লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, এসব গাছ কাটা হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে এবং সরাসরি যুক্ত ছিলেন তার ঘনিষ্ঠজন ভাগ্নে, বনমালী মো. আব্দুল্লাহ ও তার পিতা মো. জহুরুল হক।
নামাপাড়ার বাসিন্দা ভুক্তভোগী মোছা. বাছিরন নেছা ও মো. বাহেজ আলী। তাদের দাবি, বহু বছর আগে সরকারি রাস্তার পাশে তারা ইউক্লিপ্টাস, মেহগনি, আম, কাঁঠালসহ ৪৫টি গাছ রোপণ করেছিলেন। যার মাঝে ৪০ টি ইউক্লিপ্টাস। হঠাৎ করেই এগুলো কেটে নেওয়া হয়। তারা আরো জানান, রোপিত গাছের সকল প্রকার পরিচর্যা বিষয়ক ১৫ বছর আগের রাজিবপুর ইউনিয়ন কর্তৃক বৈধ চুক্তিও রয়েছে।
এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষে রাজিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ইউপি চেয়ারম্যান মিরন মো. ইলিয়াস। তিনি লিখিতভাবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে জানান, “এই গাছগুলো বাছিরন শেখ নিজ হাতে লাগিয়েছেন এবং ইউনিয়নের পক্ষ থেকে গাছ কাটার কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।” চেয়ারম্যান আরও বলেন, “একটিও গাছ উপজেলা অফিসে যায়নি। সব গাছ ইউএনওর নিজ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইউএনওর বাড়িতে নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, হয়তো সেখানেই কাঠগুলো ব্যবহার হবে।” লিখিত অভিযোগের অনুলিপি জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রাম এবং রাজিবপুর প্রেস ক্লাবেও প্রেরণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে এলাহী বলেন, “এই বিষয়ে আমার দপ্তরে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। যদি ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে কোনো বৈধ চুক্তি থেকে থাকে, সেটি তাদের দেখার বিষয়। আমি কিছু জানি না, তবে শুনেছি বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তারা তদন্ত করবে।”
এ বিষয়ে রাজিবপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিরন মো. ইলিয়াস মুঠোফোনে বলেন, “আমি একজন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা। কারও সঙ্গে মতবিরোধ হলে আমি সরাসরি সাক্ষাৎ করে বিষয়টি মীমাংসা করতে পারি। কিন্তু ইউএনও সেটা পারবেন না।”
৪৫টি গাছ কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটিও গাছ উপজেলা অফিসে যায়নি। সব গাছ তারাইটিয়া এলাকায় ইউএনওর নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে নতুন একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সম্ভবত সেই কাজেই গাছগুলো ব্যবহৃত হবে।”
তিনি আরও জানান, “ এই গাছ কেটে আনোয়ার নামে এক ব্যক্তির করাতকলে কাঠ খন্ড করা হয়। ব্যাটারি চালিত ভ্যান গাড়িতে গাছগুলো সরিয়ে নিয়ে যান। গাছ কাটার সময় সেখানে সাংবাদিক এবং একজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।”
চেয়ারম্যান অতীতের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করে বলেন,“পূর্বে উপজেলার আরও দুটি গাছ ইউএনওর ভাগ্নে পুলিশ সদস্য আরমানের মাধ্যমে স্টানবাজি করে নিয়ে যাওয়া হয়। হুমকির মুখে পড়ে আমি কিছু বলতে পারিনি। আমি তো একজন সাধারণ চেয়ারম্যান, ইউএনওর সঙ্গে শক্তি পরীক্ষার জায়গায় নেই—তাই কিছু না বলে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করেছি।”
গাছগুলো কাটার বিষয়ে সর্বপ্রথম আপনাকে কে জানিয়েছিল? ঘটনাস্থলে আরো কে কে উপস্থিত ছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন ব্যাপারী বলেন, মূলত রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ভাগ্নে এসআই আরমান ভাই, ইউএনও স্যারের বনমালী এবং সাংবাদিকসহ তারা উপস্থিত ছিলেন।
গাছগুলো আপনার কাছে কীভাবে আনা হয় বা কী বলা হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো গাছ ক্রয় করি। বলা হয়, এগুলো উপজেলা ট্রেডারের গাছ—সেই গাছের সাথেই এগুলো আনা হয়।
গাছগুলো কোথায় নেওয়া হয়, আপনি জানেন? জবাবে তিনি বলেন, গাছগুলো ৫৪ খণ্ড করা হয়। এর মধ্যে ২ খণ্ড সাংবাদিককে দেওয়া হয়, আর বাকি সব খণ্ড আরমান ভাই গাড়ি করে ডিগ্রি চরের তার বাসায় নিয়ে যান।
তিনি আরো জানান, ব্যাটারি চালিত ভ্যান গাড়িতে ভ্যান চালক মুকুল, আলম, মিজানুর, রুবেল এই কইজন গাছের খন্ড গুলো ডিগ্রী চরের দিকে নিয়ে যান।
ভ্যান চালক মুকুল হোসেন জানান, আমরা ৫ জন চালক নিয়ে যায় ডিগ্রি চরের করাতকলে রাখি, আমাদের গাড়ি ভাড়া এসআই আরমান দেন।
এসব বিষয়ে কথা হয়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বনমালী মো. আব্দুল্লাহ সাথে। নামাপাড়া এলাকায় রাস্তার পাশে লাগানো প্রায় ৪৫টি গাছ কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটা কি আপনার অনুমতি বা নির্দেশে হয়েছে?” এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল্লাহ বলেন, ভাই এই বিষয় গুলা আমি কিছুই জানি না। এগুলা সব ভুয়া মিথ্যা। এই সম্পর্কে আমার কোন ধারণাও নাই জানাও নাই। জানি বলতে এই শব্দ আমার বিতরে নাই।
স্থানীয়রা দাবি করছে আপনার পিতা ও ইউএনও’র ভাগ্নে এই গাছ কাটার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন—এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন?” এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নামাপাড়া কেমন দেখায় এটাও আমি জানি না। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ছড়াচ্ছে।
আরো কথা হয় ইউএনও’র ভাগ্নে আরমানের সাথে। শুনেছি আপনি রাজিবপুর ইউএনও ভাগ্নে এবং নামাপাড়ায় গাছ কাটার সময় উপস্থিত ছিলেন—এই বিষয়ে আপনি কী বলেন?” এই প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দেখেন আমি তো অনেক আগেই চলে এসেছি। এগুলো কোন সত্য নয় আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। আর আমি আপনাদের সাথে মিশেছি আমি কেমন আপনার তো ভালো জানেন। আর নামাপাড়া যে ঘটনাটা এটা হয় তো আমি আশার পরে হয়েছে। এটা হয়তো ব্যক্তি মালিকানা। আমি সঠিক জানিনা।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছে—আপনি নিজেই গাছ পরিবহনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমনকি কিছু কাঠ আপনার ডিগ্রী চরের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ কতটুকু সত্য? এই প্রশ্ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা মূলত আমি সত্যি জানি না। আমার ফাঁসনো হচ্ছে কে করছে এটা আমি বুঝতেছি এটা মূলত সদর চেয়ারম্যান সাথে ইউএনও স্যারের সাথে সমস্যা থাকতে পারে। আমি ইউএনও স্যারের ভাগ্নে তাই মিথ্যাভাবে ফাঁসানো হচ্ছে। আমি জুনের ২০ তারিখ চলে আসছি রাজিবপুর থেকে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্লা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তিনি এখনো অভিযোগটি হাতে পাননি। পেলে বিষয়টি দেখবেন।