• রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

ময়মনসিংহের বিশাল কর্মী সম্মেলনে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান

নিজস্ব প্রতিনিধি :
Update : শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৫

সবুজবাংলা২৪ডটকম, ময়মনসিংহ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আজকে বাংলাদেশ একটি অঙ্গীকারে আবদ্ধ। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেই বাংলাদেশে কোনো ধরনের জুলুম হবে না, শোষণ হবে না, নিপীড়ন হবে না। নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম নিবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না, যেখানে আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হবো না, যেখানে দুর্নীতির দুর্গন্ধও থাকবে না। ঘুষের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়ে কোনো নাগরিক কাঁদবে না। বিচারের বাণী আর নিভৃতে কাঁদবে না, বিচার না পেয়ে কেউ আত্মহত্যা করবে না। সেই চিত্র আর আমরা বাংলাদেশে দেখতে চাই না। এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে দল-ধর্মের অধিকারের ব্যাপারে কোনো ব্যবধান থাকবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশকে আল্লাহর বিধান এবং সুন্নাহর ভিত্তিতে দেখতে চাই। নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. প্রতিষ্ঠিত মদিনার নগর রাষ্ট্রটি ছিল লিখিত সংবিধানের ভিত্তিতে দুনিয়ার প্রথম আধুনিক রাষ্ট্র। এর আগে দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান ছিল না। মদিনা কেন্দ্রিক নগররাষ্ট্র থেকেই দুনিয়ার প্রথম লিখিত সংবিধানের জন্ম। এখান থেকেই হিউম্যান চার্টার্ড তৈরি হয়েছে এবং এটাকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দুনিয়ার কোনো মতবাদের নেই। মদিনার এই সনদের মাধ্যমেই সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, জাতির সাথে বেঈমানী করলে সে যেই ধর্মের লোকই হোক তাকে শাস্তি পেতেই হবে। বিশ্বাসঘাতকদের দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই ক্ষমা করে না। কারণ এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। মূল সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে নবী, আপনি দুনিয়ার মানুষকে জানিয়ে দিন, তিনিই (আল্লাহ) হচ্ছেন দুনিয়ার সকল বাদশাহর মালিক। আসমান-জমিনের একক কর্তৃত্ব একমাত্র তারই।’
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে তারা ধরে নিয়েছিলেন এবং তাদের অহংকারে আমাদের মনে হয়েছিল তারা কিয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তারা দেশের মজলুম মানুষকে নিয়ে উপহাস করতেন। তারা দেশপ্রেমিক লোকদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে উল্লাস প্রকাশ করেছেন, মিষ্টি বিতরণ করেছেন। তবে তারা আল্লাহর সঠিক বিচার পেয়েছেন।
তিনি ময়মনসিংহবাসীদের আশ্বস্ত করে বলেন, আল্লাহর মানবিক বিধান কায়েমে আমরা সকলে এক। আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের আল্লাহ এক, নবী এক। আমাদের জীবন বিধান এক। তার ভিত্তিতেই ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ব ইনশআল্লাহ। এতে কোনো বাধা-বিপত্তি মানব না। কোনো বাধার মুখে থেমে যাব না।
তিনি বলেন, আমরা কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করব না। আমাদের একমাত্র ভরসা আল্লাহর ওপর। সুতরাং আমরা ভয় করব একমাত্র আল্লাহকে। আমি বলতে চাই, কেউ যেন আমাদের দিকে চোখ তুলে না তাকায়। যুগে যুগে নবী-রাসূল আলাইহিস সাল্লামগণ এবং তাদের অনুসারীগণ অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছেন, তবু কারো কাছে মাথা নত করেননি। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। ঐক্যের শক্তিতেই বিজয় আসবে ইনশাআল্লাহ। কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, দেশের জনগণের মাধ্যমেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। এজন্য আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আল্লাহর ভয়ে যে হৃদয় সিক্ত, সে কারো জীবন, সম্পদ, ইজ্জত ও সম্মানের ওপর হাত দিতে পারে না। বরং সে অন্যের পাহারাদার হয়ে যায়।
তিনি বলেন, সমাজের প্রভাবশালীদের জন্য বিচার এক ধরনের, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের; সেটি চলতে দেওয়া যাবে না, সেটি বর্তমানে অচল। প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী অপরাধী হলে তারাও পার পাবেন না। ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হয় এরা ক্ষমতায় গেলে দেশ পঙ্গু হয়ে যাবে। কারণ দেশের দুর্নীতিবাজদের হাত কাটলে তো গোট দেশটাই একটা হাত কাটা দেশে পরিণত হবে। আমরা বলি, প্রথমে তাদের সতর্ক করা হবে, তাদের সম্মান-মর্যাদার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের বৈধ আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তারপরও যদি চুরি-ডাকাতি করে, তখন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। পেটের দায়ে যারা চুরি করবে তাদের হাত কাটা হবে না। ইসলাম তাদের আয়ের ব্যবস্থা করে দিবে। যারা বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-বীমা করার জন্য চুরি করবে তাদের প্রকাশ্যে হাত কাটার ব্যবস্থা করা হবে; যাতে গোটা দেশ এটা থেকে শিক্ষা নেয়। এরকম দুয়েকটি উদাহরণ নিশ্চিত করতে পারলে আশা করি চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে যিনার ব্যাপারেও উদাহরণ তৈরি করতে পারলে যৌন হয়রানিও বহুলাংশে বন্ধ হয়ে যাবে। মা বোনেরা নিরাপত্তা পাবেন। আল্লাহর বিধান কায়েম হলে দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীরা নির্মূল হবে। যারা সৎ ও পরিচ্ছন্নভাবে জীবন নির্বাহ করবে তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। তারা নিরাপত্তা পাবেন, মুক্ত পরিবেশ পাবেন। তাদের থাকবে না কোনো ভয়-ভীতি।
তিনি বলেন, মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সমাজকে চাঁদাবাজ মুক্ত হতে হবে, দখলদার ও সন্ত্রাস মুক্ত হতে হবে। আল্লাহকে ভয় করে চলে এমন একদল লোক তৈরি করতে হবে; যারা মিথ্যা কথা বলবে না, যারা মানুষকে ধোঁকা দিবে না। প্রতারণা করবে না, কারো ইজ্জতে হাত দিবে না। ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে। তবেই মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকার ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে বলেন, আমরা এই সরকারের প্রতি আধা-আধি সন্তুষ্ট। এটা কোনো দলীয় সরকার নয়। তারা একমতের মানুষ নন। তাদের সকল কর্মকা- একমুখী হয় না। ফলে দেশবাসীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিছু দিন আগে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সরকারের নিকট সুপারিশমালা জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশমালায় কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী বেশকিছু বিষয় রয়েছে। তারা সমাজকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে চান, তা জাতির জন্য লজ্জাকর। তারা দেশকে এক সর্বনাশা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে চায়, আমরা তা হতে দিবনা ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের একটি নির্দিষ্ট কৃষ্টি-কালচার, তাহজিব-তামাদ্দুন এবং আচার-প্রথা রয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তার ব্যত্যয় ঘটতে দেওয়া হবে না। তাদের সমাজবিধ্বংসী সুপারিশমালা আমরা মানব না। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনি দেশে ফিরে প্রথমেই কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিল করুন। এই জাতীয় কমিশনে ঈদানদার মহিলাদের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে, যারা কুরআন-হাদিসের পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন।
দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশবাসী পবিত্র রমজান মাসটি সুন্দরভাবে কাটাতে পেরেছেন। কিন্তু আবার মনে হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল হতে যাচ্ছে। সরকারের উচিত সে দিকে নজর দেওয়া। সমাজের শৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের পাকড়াও করুন। দ্রব্যমূল্যের সিন্ডিকেট ভেঙে দিন।
গণহত্যা প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত বলেন, যারা গণহত্যা সংঘটিত করেছে তাদেরকে আইনের বাইরে রাখবেন না। তাদের বিচার নিশ্চিত করুন। তাদের বিচার দৃশ্যমান করুন। বিগত সাড়ে ১৫ বছরের জঞ্জাল দূর করতে পর্যাপ্ত সংস্কার করুন। কালো টাকা ও পেশিশক্তি থেকে বের হয়ে এসে সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সমানুপাতিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। শুনতে পাচ্ছি আগামীর সংসদ উচ্চ ও নিম্ন দুই কক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। মূল কর্তৃত্ব থাকবে নিম্ন কক্ষের হাতে; যেটা গঠিত হবে বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে। আর উচ্চ কক্ষের নির্বাচন হবে পিআর পদ্ধতিতে। দেশবাসীর প্রশ্ন উচ্চ কক্ষ যদি পিআর সিস্টেমে হয় তবে নিম্ন কক্ষ নয় কেন? আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হল আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে হতে হবে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা জাতিকে উদাহরণ সৃষ্টিকারী নির্বাচন উপহার দেওয়ার কথা বলছেন। আমার তাদের এসিড টেস্ট দেখতে চাই। আমরা তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, স্থানীয় সরকার না থাকার কারণে জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিন। স্থানীয় নির্বাচনের এসিড টেস্ট এর মাধ্যমে আপনাদের সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা দেখতে চাই। আপনাদের কাজে সন্তুষ্ট হলে জনগণ আপনাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে যাবে। আর যদি তার ব্যত্যয় ঘটে তবে জনগণ আপনাদের লাল কার্ড দেখাবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হলে তা আমরা কিছুতেই মানব না। আমরা ১৮ কোটি মানুষকে সুবিধা দেওয়ার পক্ষে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category